একবিংশ অধ্যায় আমি শপথ করছি
এরপর আমি আবারও তৃতীয় কাকুর সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করলাম। কাকু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সময় বেশ হয়ে গেছে, তাই তিনি আগে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আবারও আমাকে সতর্ক করে দিলেন, যেন তার মেয়ের ব্যাপারে কোনো অন্যরকম চিন্তা মাথায় না আসে। আরও বললেন, অযথা দেরি না করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে এবং তার মেয়ের কোনো জিনিস না উল্টাতে, যাতে তার মেয়ে ফেরার পর কোনো ঝামেলা না হয়।
কাকু চলে যাওয়ার পর আমি ঘরের মধ্যে একটু ঘুরে দেখলাম। সত্যি বলতে কী, কাকুর মেয়ের এই বাসাটি বেশ সুন্দর। তিনটি শোবার ঘর, দুটি ড্রইংরুম, দুটি বাথরুম, সঙ্গে একটি বড় বারান্দা। মোটামুটি আন্দাজ করলে, আয়তন একশ আশি স্কোয়ার মিটারেরও বেশি হবে।
তিনটি শোবার ঘরের মধ্যে দুটি ঘরের দরজা তালাবদ্ধ ছিল, কেবল একটি ঘর খোলা ছিল। মনে হল, তালা দেওয়া ঘর দুটির একটিতে নিশ্চয় কাকুর মেয়ে থাকেন। অন্যটি কার, তা বোঝা গেল না। আর খোলা ঘরটি, স্বাভাবিকভাবেই আমার জন্য বরাদ্দ।
গত কয়েকদিন যে ভয়াবহ বাড়িতে ছিলাম, যদিও প্রতিদিন ছোট ছেলেটার সঙ্গে খেলাধুলায় বেশ মজা হচ্ছিল, তবুও সেই পরিবেশটা বেশ গুমোট ছিল। তার ওপর, একবার হলে ফিরে আসার পর কাকু আবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে কালো ছায়ার ভূতের মোকাবিলা করতে গিয়েছিলেন। যদিও আমি বিশেষ কিছুই করিনি, তবুও এখন পুরো শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল।
আমি ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে, বাতিও জ্বালালাম না, জামাকাপড়ও পাল্টালাম না, সরাসরি বিছানায় গিয়ে পড়লাম। বেশিক্ষণ লাগল না, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
স্বপ্নের ঘোরে, আবছা আবছা একটা মনোরম সুগন্ধি যেন নাকে এল। পরদিন সকালবেলা, জানালা দিয়ে রোদের আলো মুখে পড়তেই আমি হাত পা মেলে উঠতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে যে দৃশ্যটা দেখলাম, তাতে আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
আমার বিছানায়, আমার পাশেই, এক চমৎকার ছোট চুলের সুন্দরী শুয়ে আছেন।
এটা... এটা কী হচ্ছে এখানে!
আমি তখন আর দেরি না করে, সে সুন্দরীকে ভালোভাবে দেখারও সময় পেলাম না, ভয়ে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
আমি ঘর থেকে বেরোতেই দেখি, কাকুর মেয়ে রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছেন। আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দেখে তিনি প্রথমে অবাক হলেন, তারপর যেন কিছু মনে পড়ে গিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন, তারপর হাতের খুন্তি রেখে আমার কাছে এলেন। মুখে কোনো ভাবান্তর ছাড়াই আমার ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘‘তুমি গতরাতে এই ঘরে ঘুমিয়েছিলে?’’
আমি থুতনি গিলে মাথা নেড়ে বললাম, ‘‘হ্যাঁ, কারণ একমাত্র এই ঘরটাই খোলা ছিল, আমি ভেবেছিলাম তুমি ইচ্ছা করেই আমার জন্য রেখেছ।’’
আমি কথাটা শেষ করতেই, আচমকা আমার গালে তিনি একটা চড় কষালেন। যদিও খুব বেশি ব্যথা লাগেনি, তবুও ব্যাপারটা আমাকে প্রচণ্ড বিরক্ত করল।
ছিঃ, তুমি যত সুন্দরী হও, কাকুর মেয়ে হও, তাই বলে কোন কারণ ছাড়াই আমাকে চড় মারবে?
‘‘তুমি আমাকে মারলে কেন?’’ আমি গালে হাত দিয়ে কুঞ্চিত ভুরুতে কাকুর মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
তিনি ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘‘তুমি জিজ্ঞাসা করছো কেন মারলাম? সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখোনি, তোমার পাশে কেউ ছিল?’’
‘‘দে... দেখেছিলাম তো,’’ আমি তোতলাতে তোতলাতে উত্তর দিলাম।
‘‘যেহেতু দেখেছো, তাহলে বলো, তোমার উচিত ছিল না কি মার খাওয়া?’’
তার যুক্তি শুনে আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। নরম গলায় বললাম, ‘‘দেখো, আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। গতকাল আমার কাকু, মানে তোমার বাবা আমাকে এখানে থাকতে বলেছেন। আর কাকু আমাকে বলেছিলেন, তিনি তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন।’’
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আমি জানি।’’
‘‘তাহলে, তুমি আমাকে মারলে কেন? আর আমি যখন ঘুমাতে গেলাম, তখন ঘরে তো কেউ ছিল না।’’
তিনি একটু ভেবে নিয়ে, মনে হল কিছু বুঝতে পারলেন, আর কিছু বললেন না, শুধু রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আমার ঘরের দিকে চলে গেলেন।
কাকুর মেয়ে চলে যেতেই আমি লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে লাগলাম।
গতরাতে আমি নিশ্চিত, আমি বিছানায় শোয়ার সময় আমার ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাহলে আমার পাশে শুয়ে থাকা ছোট চুলের সুন্দরীটি কে ছিল? তিনি কখন এসেছিলেন?
সম্ভবত, গভীর রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়ার পরে তিনি নিজেই এসে আমার বিছানায় শুয়েছিলেন। এর বাইরে আর কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু তিনি কেন আমার বিছানায় এলেন?
আমি যখন এসব ভাবছিলাম, তখন কাকুর মেয়ে সেই ছোট চুলের সুন্দরীকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
ছোট চুলের মেয়েটিকে দেখেই আমি হতবাক হয়ে গেলাম। যদি কাকুর মেয়েকে বরফশীতল সৌন্দর্য বলে ধরা যায়, তাহলে সামনে দাঁড়ানো এই সুন্দরী সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এতটাই আকর্ষণীয়, যে কারও হুঁশ উড়িয়ে দিতে পারেন।
তার চেহারার বিস্তারিত বর্ণনা না-ই বা দিলাম, সংক্ষেপে বললে, তিনি অপূর্ব সুন্দর। তার দেহসৌষ্ঠবও সত্যিই অনবদ্য।
‘‘তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার কাজ শেষ?’’ আমি ওদিকে তাকিয়ে থাকতেই তিনি রুক্ষ গলায় বললেন।
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে, প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আচ্ছা, গতরাতে আসলে কী হয়েছিল?’’
আমার প্রশ্ন শুনে ছোট চুলের সুন্দরী বিরক্ত হয়ে কপাল টিপে বললেন, ‘‘গতরাতে আমি আর ছোট্টি দু’জনে বেশ মদ খেয়েছিলাম, ভাবিনি এমন কাণ্ড ঘটবে।’’ বলেই আমার কাছে এসে আমাকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে ঠোঁট বাঁকালেন, ‘‘চেহারা মোটামুটি সই যায়।’’
তারপর আবার কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘‘গতরাতে, আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি তো?’’
আমি সঙ্গে সঙ্গে ডান হাত তুলে শপথ করার ভঙ্গিতে বললাম, ‘‘আমি শপথ করছি, আমাদের মধ্যে কিছুই ঘটেনি।’’