পঞ্চদশ অধ্যায়: মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি
দলের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় মূল একাদশ ও দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়দের মধ্যে। মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে বেশিরভাগ ক্লাবের প্রথম আনুষ্ঠানিক ম্যাচটি এভাবেই নিজেদের মধ্যে খেলা হয়। দলটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়—এ-দল ও বি-দল, যেখানে মূল একাদশের খেলোয়াড়রা এ-দলে ও বদলি ও তরুণ সদস্যরা বি-দলে থাকে। স্ট্রাসবুর্গ কয়েক মৌসুম ধরে ফ্রান্সের শীর্ষ লীগে টিকে আছে এবং তাদের মূল একাদশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তাই প্রথম একাদশ নির্ধারণ করা খুব কঠিন নয়। বি-দল মূলত প্রথম দলের বদলিরা নিয়ে গঠিত, সব মিলিয়ে প্রথম দলে তেইশ জন খেলোয়াড়, ঠিক দুইটি পূর্ণাঙ্গ দল গঠন করা যায়, আর একজন তৃতীয় গোলরক্ষক দুই দলেরই বদলি হিসেবে প্রস্তুত থাকে।
এ ছাড়া, বদলি বেঞ্চে থাকে যুব দলের সদস্যরা। চেন হু এ-দল বা বি-দলের অংশ নয়, তাই তাকে শুরুর একাদশেও রাখা হয়নি। তবে এমন ম্যাচে বদলি খেলোয়াড়দেরও কিছুটা সময় মাঠে নামানো হয়, যাতে প্রধান কোচ পুরো দলের অবস্থা মূল্যায়ন করতে পারেন। শুধু প্রথম দলের নয়, যখন খেলোয়াড় সংকট হয় তখন কোন কোন যুব দলের সদস্যদের কাজে লাগানো যাবে তাও বোঝা যায়, এবং তরুণ খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চেন হুর অবস্থান বি-দলের বদলি। বি-দলকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন সহকারী কোচ ডমিনিক। তিনি চেন হুকে জানিয়ে দিলেন দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ পাবে, এর বেশি কিছু বলেননি, কারণ বেশিই বললে চেন হু কিছুই বুঝবে না সেটা তিনি জানতেন।
এটুকুই যথেষ্ট ছিল।
চেন হু বসে ছিল বদলি বেঞ্চে। কোনো দর্শক নেই, কোনো ক্যামেরা নেই, কিছুই নেই—এ একেবারে নীরব, নির্জন প্রস্তুতি ম্যাচ। অথচ চেন হুর উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছিল!
এটা ফ্রান্সের শীর্ষ লিগের খেলা, এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিযোগিতা ও মান উঁচু পর্যায়ের।
দু’সপ্তাহ আগেও চেন হু এমন একদল স্কুলছাত্রের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল, যারা বল থামাতেই পারে না, সেই খেলা এমনকি অপেশাদার মানেরও ছিল না। আর আজ সে ইউরোপের পাঁচটি সেরা লিগের এক ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠে নামার অপেক্ষায়!
এই অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই অনুপ্রেরণামূলক, তবে চেন হু জানে—এটি কেবল শুরু, এবং এই শুরুটা তাকে নিজের করে নিতে হবে।
ডমিনিক একবার চোখ বোলালেন বদলি বেঞ্চের দিকে। চেন হুর চোখে মুখে ছিল প্রত্যাশা ও উত্তেজনা। পাশের কয়েকজন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছিল, ইশারা করছিল চেন হুর দিকে—বিদেশ থেকে আসা আনকোরা চেহারার এই চীনা ছেলেটিকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল তারা। ডমিনিক প্রথমে কিছু বলার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু বলেননি।
আসলে, চেন হুর বসার এই স্থানটি তার নিজের ছিল না।
তাকে বলা যায় পরীক্ষামূলক খেলোয়াড় হিসেবে আনা হয়েছে, কেবল ওই সময়ে যুব প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ থাকায়, তাকে প্রথম দল ও যুব দলের সঙ্গে অনুশীলনে রাখা হয়েছিল। এই প্রস্তুতি ম্যাচে চেন হুকে বেঞ্চে বসানো হয়েছে মূলত ক্রীড়া পরিচালক ডেলাসেলের অনুরোধে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কোনো ক্লাবে এমন পরীক্ষামূলক খেলার সুযোগ খুব কমই দেখা যায়।
এর কারণও সহজ। শীর্ষ পাঁচ লিগের ক্লাবগুলোর নিজস্ব উন্নত স্কাউটিং ও যুব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকে, খেলোয়াড় উপযোগী কিনা তা পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।
এ ধরনের পরীক্ষামূলক সুযোগ সাধারণত নিু স্তরের ক্লাবগুলিতে দেখা যায়, যাদের পর্যাপ্ত বাজেট নেই স্কাউট রাখার জন্য। অধিকাংশই অখ্যাত, ফ্রি এজেন্ট খেলোয়াড়, যাদের সম্পর্কে ক্লাব কিছুই জানে না বলে কাছ থেকে দেখে নেওয়ার জন্য ডাকা হয়।
তরুণ দলের জন্য এ ধরনের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা স্বাভাবিক, তবে সেটাও সাধারণত নিু স্তরের ক্লাবেই বেশি দেখা যায়। শীর্ষ স্তরের ক্লাবগুলোর নিজস্ব যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকে, সেখানে সুযোগ পেতে হলে প্রথমে ভর্তি হতে হয়।
স্ট্রাসবুর্গ ফ্রান্সের শীর্ষ ক্লাব হিসেবে নিজস্ব স্কাউট ও যুব ভিত্তি গড়ে তুলেছে, প্রথম দলে বহুদিন ধরে পরীক্ষামূলক খেলোয়াড়ের প্রবেশ ঘটেনি। চেন হু আসলে ডেলাসেলই নিয়ে এসেছেন হাজার হাজার মাইল দূরের চীন থেকে। স্ট্রাসবুর্গের স্কাউটিং চীনে পৌঁছায় না, তাই তার পর্যবেক্ষণ কেবল এভাবেই সম্ভব।
এইভাবে, চেন হু পেয়েছে এই সোনালী সুযোগ। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে সব শূন্য, আর এই সুযোগ লুফে নেওয়াও সহজ নয়, কারণ বদলি দলের শক্তি প্রধান দলের তুলনায় অনেক কম। মাঠের স্কোরও তার প্রমাণ। প্রথমার্ধ শেষে স্কোর ২-০, এ-দল এগিয়ে।
এ-দল প্রধান একাদশ, বদলি দলের তুলনায় এগিয়ে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন ম্যাচে আসল চাপটা তাদের ওপরই, কারণ জিতলে কিছু আসে যায় না, হারলে সম্মানহানি, এমনকি প্রধান কোচ একাদশ থেকে নাম কেটে দিতে পারেন। তাই এমন ম্যাচে খেলোয়াড়েরা বেশ মনোযোগী।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হলে দুই কোচই বদলি প্রস্তুত করেন। উভয় দলই ৪-২-৩-১ ছকে খেলছিল, যা ফরাসি ফুটবলে আক্রমণ ও রক্ষণের ভারসাম্যের জন্য জনপ্রিয়।
খেলা যখন দ্বিতীয়ার্ধে গড়িয়েছে, ডমিনিক চেন হু ও আরেক তরুণকে বেঞ্চ থেকে ডাকলেন, “কেভিন, চেন, তোরা দু’জন প্রস্তুত হ!”
এই কথা চেন হু বুঝতে পারে, কারণ তার সহযোদ্ধা তাকে আগেই বলে দিয়েছিল এই শব্দের উচ্চারণ, যাতে মাঠে নামার ডাক শুনেও না বোঝার অস্বস্তি না হয়।
চেন হুর সঙ্গে ডাক পেয়েছিল কেভিন গ্যামেইরো, বর্তমানে স্ট্রাসবুর্গের যুব দলে খেলে, ক্লাবের প্রতিশ্রুতিশীল ফরাসি প্রতিভা। মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড ও ডান উইংয়ে খেলে, দারুণ গতি, বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ও একক প্রচেষ্টার ক্ষমতা আছে, দলে দৌড়ঝাঁপ, সহযোদ্ধাদের জন্য জায়গা তৈরি, বল দেওয়া—সবদিকেই পারদর্শী।
এই তরুণদের মধ্যে চেন হুর মনে সবচেয়ে দাগ কেটেছে গ্যামেইরো। সে পরিশ্রমী, চেন হুর মতোই প্রায়ই বাড়তি অনুশীলন করে, সকালেও আগেভাগেই মাঠে আসে, ফুটবলের জন্য তার উন্মাদনা স্পষ্ট। ড্রেসিংরুমে চেন হুকে প্রায়ই শুভেচ্ছা জানায়—মূলত চেন হু ছাড়া এত সকালে আর কেউ আসে না বলেই। কিন্তু কারণ যাই হোক, স্ট্রাসবুর্গে চেন হুর সবচেয়ে বেশি ভাব বিনিময় হয় গ্যামেইরোর সঙ্গেই।
গ্যামেইরো জানত চেন হুর ফরাসি এখনো দুর্বল, নিজের নাম শোনার সাথে সাথেই উঠে চেন হুর কাঁধে হাত রাখল, খেলার জন্য প্রস্তুত হতে বলল।
চেন হু আঙুল তুলে গ্যামেইরোর সঙ্গে ঠুকল, ফরাসিতে শুভকামনা জানিয়ে দু’জনে মাঠের কিনারে গেল।
পাপ্যাঁ হাত গুটিয়ে অন্য পাশের প্রস্তুতি দেখছিলেন। ডমিনিক যখন তরুণদের সুযোগ দিচ্ছেন, তখন তিনিও কিছুটা পরিবর্তন আনলেন। তিনি মূল উইংগার পিন্তুস ও রক্ষণভাগের কেতাকে তুলে নিয়ে দুই তরুণকে মাঠে নামালেন।
ডমিনিক চেন হু ও গ্যামেইরোকে কোনো বিশেষ নির্দেশনা দেননি। এই ম্যাচে জিততেই হবে এমন চাপ নেই, খেলোয়াড়দের অবস্থা দেখাই মূল লক্ষ্য, প্রচলিত কৌশলে খেলার মধ্যেও স্বাধীনতা আছে, শুধু সাবধান থাকতে হবে, যাতে বড় কোনো ইনজুরি না হয়।
চেন হু মাঠে নামতেই অনেকের কৌতূহল বেড়ে গেল। কালো চুল, হলদে চামড়ার এই লম্বা ছেলেটি ইথেইম অনুশীলন কেন্দ্রে বেশ পরিচিত মুখ। স্ট্রাসবুর্গ প্যারিস বা লন্ডনের মতো বড় শহর নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সাধারণ জীবনে খুব কমই এশীয় মুখ দেখা যায়। এমনকি হঠাৎ করে মাঠে চীনা খেলোয়াড়ের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। তার ওপর এই ছেলেটি প্রতিদিন খুব ভোরে মাঠে আসে, রাত অবধি অনুশীলন করে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সে সতীর্থদের দৃষ্টি কেড়েছে। তার ফুটবল দক্ষতাও যথেষ্ট, যদিও দলে তাল মেলাতে এখনো খাটনি হচ্ছে। ক’জন এমনও আছেন, যারা দেখতে চান—ম্যাচে তার পারফরম্যান্স কেমন হয়।
এই মুহূর্তে বি-দল মাঠে একেবারেই কোণঠাসা।
স্কোরে পিছিয়ে তো আছেই, বল দখলের লড়াইয়েও বি-দল অনেক পিছিয়ে। স্ট্রাসবুর্গ এমনিতেই বাঁচার লড়াইয়ে অভ্যস্ত, সাধারণত রক্ষণাত্মক খেলে। বদলি খেলোয়াড়রা বেশিরভাগই কার্যকরী ভূমিকার—লম্বা, শক্তিশালী, দৌড়ে অদম্য, রক্ষণে কঠোর, কিন্তু কারও টেকনিক ভালো নয়।
বিশেষত মাঝমাঠে—বদলি আক্রমণভাগে কেউ কেউ পায়ে বল ভালোই চালাতে পারে, কিন্তু মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা হয় কড়া ট্যাকল করা, নয় লম্বা দেহের, প্রকৃত অর্থে সংগঠক কেউ নেই। তাই বি-দল এখন সবদিক থেকেই এ-দলের তুলনায় পিছিয়ে। মূল সমস্যা, মাঝমাঠের ভারসাম্যহীনতা।
এই ম্যাচে চেন হু খেলবে ৪-২-৩-১ ছকের মধ্য ডান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড ও মাঝমাঠের সংযোগস্থলে। এটাই চেন হুর অবস্থান, ডেলাসেলের নজরদারিতে।