মেঘের ভাঁজে আকাশের শূন্যতা দোলা দেয়, স্বপ্নের রাজ্যে এক মহা-স্বপ্ন। চতুর্তিপঞ্চাশতম অধ্যায় এক স্বপ্নময় জীবন

প্রাচীন শাসক শূন্যগর্ভ বৃক্ষ 3238শব্দ 2026-03-19 03:30:57

叶 ইউয়ানডিয়ানের ভ্রু কুঁচকে উঠল, মাথা নেড়ে বলল, ‘‘জানি না।’’

ছোট সাপটি তার কাঁধে গা ঘেঁষে গন্ধ শুঁকল এবং কুটিলভাবে বলল, ‘‘আয়, বল তো, একটু আগে ওইটা কী রকম ধনরত্ন ছিল।’’

‘‘বলার আছে অনেক কিছু,’’ ইউয়ানডিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

সেই বছর শূন্য-ছায়ার অন্ধকূপে, তার চেতনা তখন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, সে জানত না শূন্য-ছায়ার পাথর কীভাবে বৈচিত্র্য এনেছিল। আজকের এই অঘটনে ইউয়ানডিয়ান পুরোপুরি বিভ্রান্ত, একেবারেই বুঝতে পারছে না কী হয়েছে।

ইউয়ানডিয়ানের মুখভঙ্গি দেখে, ছোট সাপটি গত কয়েক বছরে তার কিছুটা ধারণা পেয়েছে, জানে সে সম্ভবত মিথ্যে বলছে না। তাই মনকে গুটিয়ে নিল, ঝাঁপিয়ে পড়ল ইউয়ানডিয়ানের কাঁধ থেকে।

‘‘এত কিছু ভেবে লাভ নেই আপাতত,’’ সে নিচু স্বরে বলল, সামনে শুয়ে থাকা শেন বংশের প্রবীণের দিকে তাকিয়ে।

বাইরের মৃদু আলোয় দেখা যায় ঘরের সব মোমবাতি নিভে গেছে। প্রবীণের কথা অনুযায়ী, যখন মোমবাতি নিভে যাবে, তখনই তার জীবনাবসান হবে।

এখন সে একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, দেহে এখনও হালকা প্রাণের ছোঁয়া টিকে আছে।

তিনবার নিশ্চিত হয়ে, ছোট সাপটি বড় বড় চোখ মিটমিট করে বলল, ‘‘মৃত, কিন্তু বোধহয় পুরোপুরি মরেনি।’’

ইউয়ানডিয়ান বিস্ময়ে চেয়ে রইল।

ছোট সাপটি লেজ দিয়ে মাথা চুলকাল, আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘‘আসলে, আমি—তোমার ড্রাগন দাদু, এ রকম অদ্ভুত মৃত্যু আগে দেখিনি।’’

ইউয়ানডিয়ানের চোখে গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। আজ সে কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছিল। সাধনার স্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সে ভেবেছিল ছোট সাপের সঙ্গে মিলে এই প্রবীণের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে।

যদি শূন্য-ছায়ার পাথর না থাকত... ইউয়ানডিয়ান মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভিতরে তাকিয়ে দেখে, সেটি এখনও আকাশী-নীল রঙের জলবিন্দুর মতো, চুপচাপ তার চেতনার কেন্দ্রে নিদ্রিত, চেতনার কুয়াশার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে।

‘‘ওর মস্তিষ্ক ভেদ করো,’’ ছোট সাপটি প্রবীণকে ঘুরে এসে বলল।

ইউয়ানডিয়ান কিছু বুঝতে পারল না, নাকি পুরোপুরি মরেনি বলে নিশ্চিত হতে চায়?

ছোট সাপটি গভীরভাবে শুঁকল, ‘‘নির্মল চেতনা স্তরের পরে সাধকরা চেতনার সমুদ্রে প্রয়োজনীয় জিনিস জমা রাখে। সে তো প্রবীণ, নিশ্চয়ই প্রচুর ধনরত্ন আছে।’’

এ কথা শুনে ইউয়ানডিয়ান একটুও দেরি করল না, হাতে থাকা ছুরির ঝলক দেখিয়ে প্রবীণের মস্তিষ্কে সজোরে আঘাত করল।

কোনও দুর্গন্ধ এল না, বরং হালকা সুগন্ধ প্রবীণের মস্তিষ্ক থেকে ছড়িয়ে পড়ল।

ছোট সাপটি পাশে ব্যাখ্যা করল, ‘‘প্রাণশক্তি স্তরের সাধকরা বিপুল প্রাকৃতিক শক্তি ও প্রাণশক্তি দেহে ধারণ করে, মানুষরূপী মহৌষধ বললেও কম বলা হয়।’’

‘‘আহা, সত্যিই মহৌষধ আছে,’’ ছোট সাপটি বিস্ময়ে বলল।

দেখা গেল, এক ফ্যাকাশে সবুজ মূলের মতো বস্তু দু’জনের সামনে উদ্ভাসিত, যা ছোট মানুষের মতো হাত-পা মেলে আছে, কিন্তু মাথা নেই, এখনো পুরোপুরি বেড়ে ওঠেনি।

ঘন প্রাকৃতিক শক্তি মুহূর্তেই গোটা ঘর ভরিয়ে দিল, কাঠের দরজার ফাঁক গলে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ঘন শক্তির স্রোতে ইউয়ানডিয়ানের মনে হল যেন সে মদ্যপ।

ছোট সাপটি তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘শোন, তাড়াতাড়ি চেতনার সমুদ্রে রেখে দাও!’’

ইউয়ানডিয়ানের চোখে শীতল ঝিলিক, সে আঙুল তুলে ওই বস্তুটিকে চেতনার সমুদ্রে নিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, সঙ্গে সঙ্গেই শক্তি ছড়ানো বন্ধ হয়ে গেল।

সবদিকে ঘন শক্তি ঘিরে রয়েছে। ইউয়ানডিয়ান কৌতূহলভরে বলল, ‘‘এটা কী?’’

ছোট সাপটি একদিকে একটি ভাণ্ডার খোলার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘‘এটা হল আদিম সার, আক্ষরিক অর্থে প্রাকৃতিক শক্তির বাস্তব রূপ, যদিও এই গাছটি এখনো সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি।’’

অনেক কষ্টে সে ভাণ্ডার খুলে বলল, ‘‘এর মধ্যে যে বিশুদ্ধ শক্তি আছে, এখন তুমি যদি এক চুমুকও নাও, শরীর ফেটে মৃত্যু হবে।’’

ইউয়ানডিয়ান গভীর শ্বাস নিল। আদিম সার যে পরিমাণ শক্তি ধারণ করে, তার বিপুল চেতনার সমুদ্র ও সংহত আত্মার জন্য বড় সহায়ক।

‘‘তুমি কি লোভী হলে না?’’ ইউয়ানডিয়ান কৌতূহলভরে বলল।

ছোট সাপটি অবজ্ঞাভরে বলল, ‘‘আমরা এই প্রাচীন জাতের প্রাণী, সাধকদের মতো না, শুধু নির্দিষ্ট ভেষজ আমাদের কাজে লাগে। এটা পুরোপুরি বিকশিত হলে, তোমার ড্রাগন দাদু একটু লোভী হত।’’

ইউয়ানডিয়ান মনে মনে হাসল, ছোট সাপটি ঠিকই বলেছে, ও বাইরে থেকে এনে দেওয়া ভেষজ কেবল মুখের স্বাদ নেওয়ার জন্য চিবোয়।

অনেক ঝামেলা করে ছোট সাপটি ভাণ্ডার খুলল, মুখে বিড়বিড় করতে লাগল—‘‘ধনরত্ন, ধনরত্ন!’’

তাড়াতাড়ি মাথা গুঁজে ভাণ্ডারে ঢুকল। অনেকক্ষণ খুঁজে, ছোট মাথা বের করে, ইউয়ানডিয়ানের দিকে অপলক তাকিয়ে, মুখে কি যেন চিবোচ্ছে।

‘‘কী হয়েছে?’’ ইউয়ানডিয়ান জিজ্ঞেস করল।

‘‘একটা,’’ ছোট সাপটি কঠোরভাবে চিবিয়ে গিলে বলল, ‘‘একটা বাজে ধনরত্ন।’’

সে হাত পাকিয়ে ভাণ্ডার থেকে পড়ে গেল, লেজ দিয়ে শুধু একটা মরচে ধরা ব্রোঞ্জের ঘণ্টা আঁকড়ে ধরে বলল, ‘‘তোমার ড্রাগন দাদু আর আশা করব না, এই স্তরের সাধকেরা সবাই গরিব।’’

ইউয়ানডিয়ানের মনে সন্দেহ জাগল, ভাণ্ডারে উঁকি দিল, দেখতে চাইলে কী আছে। কিছুক্ষণ পরে সে অবাক হয়ে ছোট সাপকে বলল, ‘‘এত কিছু!’’

‘‘বেশি তো আছে, কিন্তু আমার কোনো কাজে আসে না!’’ ছোট সাপটি হতাশ হয়ে একদম পড়ে রইল।

ভাণ্ডারভর্তি হাজার খানেক নানা ধরনের ওষুধ, প্রবল জাদুশক্তি ছড়াচ্ছে, প্রতিটি ইউয়ানডিয়ান আগের জাদু স্কুলে যে ক’টা ভেষজ পেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি শক্তি জোগাবে।

‘‘তুমি খেয়ে নাও, সব খেয়ে ফেলো,’’ ছোট সাপটি ক্লান্ত হয়ে পাশ ফিরল, ‘‘এখন ফিরলে তোমার ড্রাগন দাদুকে আর চুরি করে ভেষজ খাওয়াতে হবে না।’’

‘‘এখন?’’ ইউয়ানডিয়ান বলল।

ছোট সাপটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু গড়িয়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, সব খেয়ে ফেলো, আমাকে রেখো না, দেখলে মেজাজ খারাপ হয়।’’

ইউয়ানডিয়ান একটু ভেবে মনে মনে বলল, সে তো এখন শেন পরিবারের প্রবীণকে মেরেছে, এই দরজা পেরোলেই শেন পরিবারের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী শত্রুতা শুরু হবে, সাধনা বাড়ানোই ভালো।

ক’মাসের বৃষ্টি শেষে অবশেষে শান্তি নেমেছে। উষ্ণ বসন্ত পার হয়ে, দাহ্য গ্রীষ্ম পেরিয়ে, শীতল শরতে প্রবেশ করেছে। আকাশে ঘন বাদামি শুকনো পাতাগুলো ভাসছে, হালকা বাতাসে হিমেল পরশ।

শেন বংশের শেন ওয়েনচাও ও অন্যান্য সাধকরা তখন ঘরের বাইরে অপেক্ষায়। ইউয়ানডিয়ান প্রবীণের ঘরে ঢোকার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, শেন ওয়েনচাও উদ্বিগ্ন।

শেন ওয়েনচাও ঘরের দিকে তাকাল, মনে অস্থিরতা। প্রবীণের স্বভাব অদ্ভুত, সে সাহস করে বিরক্ত করতে পারে না, কিন্তু আগে কখনও প্রবীণ এতদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল না।

এ কথা মনে পড়তেই ওয়েনচাওর মনে ইউয়ানডিয়ানের কথা এল। যদিও সে মনে করে না, নির্মল চেতনা স্তরের মাঝামাঝি সাধক প্রবীণের সামনে কিছু করতে পারবে, তবুও তার মনে দুশ্চিন্তা।

বিশেষ করে আগের সেই আকাশী আলো, যা তাদের আনন্দ দিয়েছিল, ওয়েনচাও আরও অস্থির হল। তার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রবীণ এতদিন বাহির না হওয়ার সঙ্গে এ ঘটনার যোগ আছে।

ঘরের বাইরে, শেন ওয়েনচাওর আপন ভাই, যিনি নির্মল চেতনা স্তরের শিখরে, নিচু স্বরে বলল, ‘‘দাদা, আর টানা যাবে না।’’

ওয়েনচাও ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়ল, মনে মনে বলল, এভাবে চলতে থাকলে শেষ কোথায়।

সে আর দেরি না করে প্রবীণের বাড়ির সামনে নতজানু হয়ে প্রণাম করল। তার সঙ্গে সঙ্গে শেন পরিবারের সবাই হাঁটু গেড়ে বলল, ‘‘আমরা গোটা পরিবার, বিনীত প্রার্থনা করছি, প্রবীণ যেন বাহির হন!’’

এটা ছিল ওয়েনচাওর পরিকল্পনা। গোটা পরিবারকে জড়িয়ে, যাতে প্রবীণ রাগ করলে দায় একার উপর না পড়ে।

অনেকক্ষণ পরও দরজা বন্ধ, কোনও সাড়া নেই। ওয়েনচাও দাঁত চেপে আবার বলল, ‘‘প্রবীণ অনেক মাস যাবৎ বাহির হননি, সবাই দুশ্চিন্তায় ভুগছে।’’

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা, তবু দরজার ভেতর নিস্তব্ধতা। ওয়েনচাও বলল, ‘‘আজ প্রবীণ বাহির না হলে, আমাদের প্রবেশ করতে হবে, দয়া করে দোষ দেবেন না।’’

এমন সময় কড়া নাড়ার শব্দ, প্রবীণের বাড়ির কাঠের দরজা খুলে গেল। না ছিল আগের মতো শীতলতা, বরং এক সাধারণ ঘর।

ওয়েনচাও সাহস করে ভেতরে তাকাল, ঘর অন্ধকার। প্রথম প্রবীণকে দেখার দিন থেকেই ঘর এমনই।

এ ভাবনায় ওয়েনচাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, তবে মাথা আরও নিচু করল, এক মুহূর্তও থামল না। প্রবীণের স্বভাব তো অদ্ভুত, আজ জোর করে তাকে ডাকার অপরাধ বড়, হঠাৎ ঘরের অন্দর থেকে ধীর পায়ে কারও হেঁটে আসার শব্দ শুনে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।

ততক্ষণে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে ইউয়ানডিয়ান, চোখ আধখোলা। চত্বরের মধ্যে跪ে থাকা ওয়েনচাও ও শেন পরিবারের দিকে চাইল, প্রথমে অবাক, পরে বোঝে ওয়েনচাও তাকে প্রবীণ ভেবেছে।

ইউয়ানডিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল, চারপাশে খুঁজল, অবশেষে ভিড়ের শেষ মাথায় দেখতে পেল সেই চেনা ছায়া।

সে অন্যদের মতো跪 করেনি, উঠোনের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে, মুখ গম্ভীর, চোখে কোনও দীপ্তি নেই, মাথা নিচু করে শুকনো পাতার দিকে তাকিয়ে কী ভাবছে বোঝা গেল না।

‘‘ইউয়ানডিয়ান!’’

কেউ যেন চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই跪 করা লোকটির দিকে তাকাল, ইউয়ানডিয়ানের দিকে।

এই নামটি, যেন রাতের শেষ প্রহরে দীপ্তি ছড়াল, তার চোখে আবার আলো ফুটল। চমকে উঠে সে অবিশ্বাসে ইউয়ানডিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

ওয়েনচাওর মুখে ভয় জমল, অশনি সংকেত মনে হল, রাগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘ওকে ধরো!’’

ইউয়ানডিয়ান কিন্তু এক পা বাড়িয়ে, ছায়ার মতো অদৃশ্য হয়ে শেন মেংঝুর সামনে এসে দাঁড়াল। মেংঝু এখনো কিছু বুঝে ওঠেনি, ইউয়ানডিয়ান হেসে বলল, ‘‘ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’’

মেংঝুর বুক কেঁপে উঠল, চেনা হাসি দেখে মনে হল যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল, যদিও এই স্বপ্ন তাকে প্রায় ছয় মাস ধরে কষ্ট দিয়েছে।