পঞ্চাশতম অধ্যায় — সপ্তর্ষিমণ্ডল

যমরাজ আগমন করেছেন অতুলনীয় দুঃশাও 3436শব্দ 2026-03-19 11:27:37

দুয়ান তখনও আধো ঘুমে, বিরক্ত গলায় বলল, ‘‘তুমি তিয়ান সিং হও কিংবা সপ্তর্ষি, গভীর রাতে মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত করোনা তো! জরুরি কিছু থাকলে কাল বলো।’’

টেলিফোনটা কেটে দিল দুয়ান। এই দৃশ্য যদি চিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দেখত, তবে নিশ্চয়ই দুয়ানকে কড়া ভাষায় গালাগালি দিত।

এক মিনিটের মতো কেটে যাওয়ার পর, হঠাৎ দুয়ান তীব্র ঘুম ঘুম ভাব থেকে জেগে উঠল। কী যেন একটা মনে পড়ে গেল তার, তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে আবার ডায়াল করল।

‘‘আবার কেন সপ্তর্ষিকে ফোন দিচ্ছ? ঘুমিয়ে থাকো, স্বপ্ন দেখো তোমার।’’

তিয়ান সিংয়ের কণ্ঠে অভিমান।

‘‘হাহা! তিয়ান সিং ম্যাডাম, আপনি আমায় ফোন করেছিলেন?’’ দুয়ান মুখে হাসি ফুটিয়ে ভান করল কিছুই হয়নি।

‘‘আসলে তোমার কাছে একটা সাহায্য চাইছিলাম, কিন্তু তুমি যেহেতু ঘুমোচ্ছো, থাক, দরকার নেই।’’

তিয়ান সিংয়ের সুর ঠান্ডা নিস্পৃহ।

দুয়ান মনে মনে লজ্জিত, সিনেমা হলে জোর করে তাকে চুমু খাওয়ার ঘটনার পর থেকেই একটা অপরাধবোধ কাজ করে তার মধ্যে। আজ তিয়ান সিং নিজেই ফোন করায়, সে আর না করতে পারল না।

‘‘ভোর হয়ে গেছে, এখনো ঘুমোচ্ছো কেন? আপনি কী সাহায্য চান বলুন, আগুনে ঝাঁপ দিয়েও আপনার জন্য কিছু করতে রাজি আছি।’’

মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখল, মাত্র সকাল সাতটা দশ। মনে মনে বিরক্ত হলো।

ওপাশে হালকা হাসি, তারপর আবার স্বরটা নিস্পৃহ, ‘‘আগুনে ঝাঁপ দিতে হবে না, এখনই বাস টার্মিনালে এসো, আমরা টিকিট কাউন্টারে দেখা করব।’’

বাস টার্মিনাল? কোথাও যাচ্ছি নাকি?

আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখল, ওদিক থেকে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছে।

দুয়ান দ্রুত উঠে মুখ ধুয়ে, মাত্র পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। নাস্তা পর্যন্ত খাওয়ার সময় নেই।

সপ্তাহান্তের সকালে বাস টার্মিনাল উপচে পড়া ভিড়। দুয়ান কষ্ট করে ঢুকে টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দেখতে পেল—তিয়ান সিং লাইন দিয়ে টিকিট কিনছে।

‘‘তিয়ান সিং ম্যাডাম, কোথায় যাচ্ছি আমরা?’’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল দুয়ান।

তিয়ান সিং হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ এগিয়ে দিল, ‘‘এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছো, নিশ্চয়ই নাস্তা করোনি।’’

দুয়ান ব্যাগ খুলে দেখে, ভিতরে আছে তেলেভাজা আর সয়াবিনের দুধ। সঙ্গে সঙ্গে তার খিদে চাগাড় দিল, ‘‘তিয়ান সিং ম্যাডাম, আপনি তো দারুণ খেয়াল রাখেন, একেবারে বান্ধবীর মতো।’’

তিয়ান সিং লজ্জায় লাল হয়ে গেল, মুখে কঠিন ভাব ধরে বলল, ‘‘কি যে বলো! এমন ভাব করছ, যেন সত্যিই তোমার বান্ধবী আছি।’’

দুয়ান চোখ ঘুরিয়ে মনে মনে ভাবল, ভূতের বান্ধবী হলে কি চলবে?

‘‘তোমার পরিচয় পত্র দাও, আমি টিকিট কেটে আনি, তুমি গিয়ে বসে নাস্তা করো।’’

দুয়ান পরিচয় পত্র এগিয়ে দিল, নিজে গিয়ে ওয়েটিং রুমে বসলো। কিছুক্ষণ পর তিয়ান সিং এসে দুইটা টিকিট ধরিয়ে দিল, ‘‘তোমারটা।’’

‘‘চিয়াং সিটি থেকে লান সিটির টিকিট! আমাদের লান সিটিতে যেতে হচ্ছে?’’ হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে দুয়ান বিস্ময়ে চেয়ে বলল, ‘‘না, সত্যি তো? পরিবারের লোকেদের সঙ্গে দেখা করতে? আমি তো মানসিকভাবে প্রস্তুত নই!’’

দুয়ানের নার্ভাস ভাব দেখে তিয়ান সিং হাসতে হাসতে দু’হাত ভাঁজ করল, ‘‘তুমি তো নিজেই সাহায্য করতে রাজি হয়েছো, এখন পিছিয়ে আসা চলবে না। আর সেদিন তো তুমিই ঝামেলা করেছিলে, মায়ের কানে গেছে, আমার বাড়িতে পুরুষ ছিল—এটার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।’’

দুয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ‘‘কীভাবে দায়িত্ব নেব? আমাকে বিয়ে করতে হবে নাকি?’’

তিয়ান সিংয়ের মুখ লাল হয়ে উঠল, চোখ বড় বড় করে বলল, ‘‘তুমি যা ভাবছ, তা কিছুই না। কিছুদিনের জন্য ছদ্মবেশে আমার ছেলের বন্ধু হওয়ার ভান করবে।’’

‘‘কতদিন?’’ দুয়ান সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলল মূল কথা, ‘‘মানে, তোমার বাড়িতে রাত কাটাতে হবে?’’

তিয়ান সিং আরও লজ্জায় পড়ে বলল, ‘‘আমার বাড়ি কি মানুষের পাচারকারীর আস্তানা নাকি, এ নিয়ে ভয় কী?’’

দুয়ান ভয় পাচ্ছিল না, বেশ নার্ভাস লাগছিল, ‘‘আমি কোথায় ঘুমাব? তোমার ঘরে একসাথে তো না নিশ্চয়!’’

তিয়ান সিং মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘‘তুমি যা ভাব, তা হবে না। মাটিতে বিছানা পাতো, কিংবা সোফায় ঘুমাও, যা ভালো লাগে।’’

এই নিয়ে হাসি ঠাট্টার মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল। শহর ছাড়িয়ে বাস যখন হাইওয়েতে ছুটে চলল, দুয়ান বাইরের দ্রুত পালানো গাছপালা দেখে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করল।

‘‘তিয়ান সিং ম্যাডাম, এটাই প্রথমবার লান সিটিতে যাচ্ছি। ওখানে ঘুরে দেখার মতো, খাওয়ার মতো কিছু আছে? অবশ্যই আমাকে নিয়ে যেতে হবে।’’

তিয়ান সিং কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘‘লান সিটি খুব একটা বড় নয়, সাধারণ পাঁচ নম্বর বা তার নিচের সারির শহর। বেশি কিছু দেখার নেই, তবে স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলো খুব বিখ্যাত। তোমাকে নিয়ে চলব।’’

‘‘তাহলে তো খুব ভালো! আমার খিদে প্রচণ্ড, নিশ্চয়ই আপনার অনেক খরচ হবে।’’

তিয়ান সিং হাসল, ‘‘ওসব খাওয়ার দাম খুবই কম, তুমি কি আমায় দেউলিয়া করে দেবে?’’

‘‘খাওয়া-দাওয়া শেষে সিনেমা দেখতে যাব?’’ দুয়ানের দুষ্টুমি বেরিয়ে এল।

তিয়ান সিং সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আগেরবার ভৌতিক সিনেমা দেখতে গিয়ে দুয়ান জোর করে চুমু খেয়েছিল, এবার হাই হিল জুতার গোড়ালি দিয়ে দুয়ানের পায়ে গুতো মারল, ‘‘আর কখনও সেই দিনের কথা তুলবে না, শুনলে?’’

দুয়ান ব্যথায় মাথা নাড়ল।

এভাবে খুনসুটির মাঝে সময় কেটে গেল, বাস পৌঁছে গেল গন্তব্যে।

তিয়ান সিং কলেজ শুরু হওয়ার পর থেকে আর বাড়ি যায়নি, চারপাশের চেনা দৃশ্য দেখে ভেতরে অজানা উত্তেজনা কাজ করছিল।

‘‘তিয়ান সিং ম্যাডাম, জামাই হিসেবে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি, কিছু উপহার তো নিতেই হয়, না?’’ দুয়ান হাসল।

তিয়ান সিংয়ের মুখ টকটকে লাল, একেবারে পাকা আপেলের মতো, ‘‘কী যে বলো! জামাই-টামাই কিছু না, বাজে কথা বলো না।’’

‘‘তোমার ছদ্ম প্রেমিক সাজতে হচ্ছে না?’’ দুয়ান অবাক ভাব করার ভান করল।

তিয়ান সিং এত লজ্জা পেল, কান পর্যন্ত লাল, ‘‘এখন বাবা-মা নেই, অভিনয় করার দরকার নেই। বাড়িতে গিয়ে করো।’’

দুয়ান গম্ভীর মুখে বলল, ‘‘তা হয় না। এত দূর থেকে এসেছি, অভিনয়ে ফাঁকি দিলে ধরা পড়ে যাব। তাই এখন থেকেই শুরু করতে হবে, যাতে মনে হয় সত্যিই আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা।’’

তিয়ান সিং জানে দুয়ান ইচ্ছে করেই তাকে বিব্রত করছে, কিন্তু যুক্তির ত্রুটি ধরতে পারল না।

‘‘তিয়ান সিং ম্যাডাম, কী বলো?’’ দুয়ান মুখে দুষ্টু হাসি।

তিয়ান সিং মনে মনে খুব চটেছিল, সে কিনা চিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, এমন অপদস্থ হয় ছেলেটার কাছে! নিজেকে সামলে বলল, ‘‘ঠিক আছে, তাহলে এখন থেকেই অভিনয় করো। এখনো আমাকে তিয়ান সিং ম্যাডাম বলে ডাকছো? তোমার অভিনয় খুবই দুর্বল।’’

দুয়ান কোনো তোয়াক্কা না করে এক ধাপ এগিয়ে, কোমরে হাত রেখে বলল, ‘‘সোনামনি! দেখো না, সব প্রেমিক-প্রেমিকা মেয়েরা ছেলেদের বাহু ধরে হাঁটে, তুমি জানো কী করতে হবে।’’

তিয়ান সিং লজ্জায় কুঁকড়ে গেল, শেষে নিঃশব্দে কোমল হাতে দুয়ানের বাহু ধরল। চামড়া ছোঁয়ার মুহূর্তে দুজনেই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট।

দুজনেই কখনো প্রেম করেনি, তাদের জীবনে শুরু হলো এক নতুন যাত্রা। দুয়ান রাস্তার ধারে সুপারশপ দেখে বলল, ‘‘তিয়ান সিং... মানে সোনামনি! ওখানে একটা বড় সুপারশপ আছে, চলো, মা-বাবার জন্য কিছু কিনি।’’

তিয়ান সিং এখনো দুয়ানকে সোনামনি ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে গা শিউরে ওঠে। ‘‘বাস টার্মিনাল থেকে বাড়ি কিছুটা দূরে, এত জিনিস কিনে নিয়ে যাওয়া ঝামেলা, বাড়ির কাছের সুপারশপ থেকেই কিনে নেব।’’

তাই দুজনে একটা ট্যাক্সি ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিল। বাড়ি যত কাছে আসছিল, তিয়ান সিংয়ের নার্ভাসনেস বাড়ছিল।

ট্যাক্সি থামল হোং ইয়ান কমিউনিটির গেটে। তিয়ান সিং ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দুয়ানকে নিয়ে নামল। হাঁটতে হাঁটতে দুয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘‘সোনামনি! কিছু ভুলে গেছো না?’’

দুয়ানের বাহুটা উঁচুতে দেখে, চোখ উল্টে তিয়ান সিং ওর হাতটা আবার ধরল।

‘‘ছোকরা, দুই দিন তোকে ছাড়ব, স্কুলে ফিরলে দেখে নেবো!’’ মনে মনে গজগজ করল তিয়ান সিং।

কমিউনিটির বাইরে একটা ‘জিয়া মানফু’ সুপারশপ। দুজনে পাশাপাশি হাঁটে, দেখে মনে হয় সদ্য প্রেমে পড়া যুগল।

এক চক্করে অনেক ফল, সিগারেট, মদ কিনে ফেলল দুয়ান। এখন সে ছোটখাটো কোটিপতি, এসব জিনিস তার কাছে কিছুই না।

‘‘সোনামনি, দেখো তো, ঠিক আছে? মাকে কি এক সেট প্রসাধনী কিনে দেব?’’ প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসা, কিছুই জানে না দুয়ান।

তিয়ান সিং দেখে দুয়ান ঠেলাগাড়িতে কত কিছু ভরেছে, গা জুড়ে একটানা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।

‘‘এতেই হবে। প্রথমবার এলে বেশি দামি কিছু দেওয়া ঠিক না, শুধু শুভেচ্ছা জানাও, ব্যস।’’

তিয়ান সিং জানে দুয়ানের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়, তাই বাড়তি খরচ করতে দিতে চায় না।

‘‘ঠিক আছে, এইবার এতেই চলবে, পরে আবার এলে মাকে একটা জেডের চুড়ি কিনে দেবো।’’

তিয়ান সিং চোখ উল্টে ভাবল, ছেলেটা আবার আসার স্বপ্ন দেখছে নাকি! বেশিই মিশে যাচ্ছো মনে হচ্ছে।

ক্যাশ কাউন্টারের দিকে যাওয়ার পথে, পাশের এক দোকানের সামনে তিয়ান সিং থেমে গেল, ‘‘দুয়ান... মানে ইউন দাদা! তোমার এই ট্র্যাকস্যুট পরে দেখেছো, একেবারে কলেজ ছাত্রের মতো লাগছে। একটা স্যুট কিনবে?’’

দুয়ান জীবনে কখনো স্যুট পরেনি, কিন্তু প্রেমিক সাজার অভিনয়ে ঠিক যেন ভুল না হয়, তাই রাজি হয়ে দোকানে ঢুকল।

‘‘ম্যাডাম, প্রেমিকের জন্য স্যুট পছন্দ করতে এসেছেন?’’ বিক্রয়কর্মী এগিয়ে এল হাসিমুখে।

তিয়ান সিং লজ্জায় ফিসফিসিয়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, দেখুন তো, ওর মাপের কিছু আছে?’’

বিক্রয়কর্মী দুয়ানকে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘‘আপনার প্রেমিকের গড়ন চমৎকার। আমাদের নতুন মডেলের স্যুট আছে, ঠিক ওর জন্যই। পরলে খুব ফিট করবে।’’

দুয়ান এত প্রশংসায় খানিকটা অস্বস্তি পেল, গম্ভীর মুখে বলল, ‘‘চলেন, দেখি।’’

দোকানে ঢুকে দেখল, সারি সারি ফ্যাশনেবল স্যুট। দুয়ানের মনে হলো, যেটাই পরুক, দারুণ লাগবে।

‘‘ওই নীল রঙেরটা দেখান,’’ পছন্দ করল তিয়ান সিং।

ব্যবসায়ী সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘‘ম্যাডামের চোখ খুব ভালো। এটা আমাদের হাইলান হোমের নতুন শরৎকালীন কালেকশন, দামও বেশি না, এক সেটে মাত্র এক হাজার দুইশো আটাশি। প্রেমিককে পরিয়ে দেখুন।’’

তিয়ান সিং স্যুটের কাপড় ছুঁয়ে দেখল, ভালোই লাগল, মাথা নেড়ে বলল, ‘‘ঠিক আছে, এইটাই পরিয়ে দেখি।’’

ব্যবসায়ী স্যুটটা এগিয়ে দিল, দুয়ান সেটা নিয়ে চেঞ্জ রুমে ঢুকতেই চমকে উঠল, ‘‘দুঃখিত দুঃখিত, জানতাম না ভেতরে কেউ আছেন!’’